বিষয়বস্তুতে চলুন

নীলাঞ্জনা

বইপিডিয়া থেকে
নীলাঞ্জনা
নাম নীলাঞ্জনা
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি
লেখক আশাপূর্ণা দেবী


প্রকাশনা তথ্য
প্রকাশক রবীন্দ্র লাইব্রেরী
প্রকাশনার স্থান কলকাতা, ভারত
প্রকাশনার তারিখ ১৯৬৭



বিস্তারিত বিবরণ
ভাষা বাংলা
বিষয় সামাজিক সমস্যা, দাম্পত্য সংকট, আদর্শ বনাম বাস্তবতা, মনস্তত্ত্ব


নীলাঞ্জনা হল প্রখ্যাত কথাশিল্পী আশাপূর্ণা দেবী রচিত একটি গভীর জীবনবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী উপন্যাস। এই উপন্যাসে লেখিকা একজন লেখকের (বিম্বিসার রায়) দৃষ্টিকোণ থেকে বন্ধুত্ব, প্রেম, দাম্পত্য জীবনের সংঘাত এবং আদর্শের নামে ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে কথাসাহিত্যিক বিম্বিসার রায়, তাঁর বন্ধু সুমিত্র মিত্র এবং সুমিত্রর স্ত্রী নীলাঞ্জনাকে কেন্দ্র করে। সুমিত্র ছিলেন একজন উগ্র আদর্শবাদী দেশসেবক, যিনি ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, পারিবারিক জীবন এমনকি নিজের স্ত্রীর অনুভূতিকেও 'দেশের কাজ' বা 'ত্যাগের' দোহাই দিয়ে অবহেলা করতেন। নীলাঞ্জনা চেয়েছিলেন একটি স্বাভাবিক সংসার, স্বামী ও সন্তানের অধিকার। কিন্তু সুমিত্রর অতিরিক্ত আদর্শবাদ এবং সংসার বিরাগ নীলাঞ্জনাকে এক চরম অভিমানে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে।

গল্পটি বর্তমান এবং অতীতের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে এগিয়েছে। বিম্বিসার রায়ের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে নীলাঞ্জনার সেই অভিমানী মুখ, যে বলেছিল—"মেয়েদেরকে তোমরা নিজেদের বাঁচার উপকরণ ছাড়া আর কিছু ভাবো না।" নীলাঞ্জনা ঘর ছাড়ার পর তাঁর কী পরিণতি হয়েছিল, এবং তাঁর রেখে যাওয়া সন্তান সুরঞ্জনার ভবিষ্যৎ কী হলো—তা নিয়েই কাহিনীর পরবর্তী মোড়। আদর্শের সংঘাত কীভাবে একটি সাজানো সংসার এবং পরবর্তী প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, তা এই উপন্যাসে নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে।

  • বিম্বিসার রায়: উপন্যাসের কথক এবং একজন জনপ্রিয় লেখক। তিনি তাঁর বন্ধু সুমিত্র এবং নীলাঞ্জনার জীবনের সাক্ষী। তাঁর লেখনী ও চিন্তায় বারবার ফিরে আসে নীলাঞ্জনার স্মৃতি।
  • সুমিত্র মিত্র: বিম্বিসারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ধনী পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করে দেশসেবায় ব্রতী হন। তাঁর এই 'অবাস্তব কৃচ্ছ্রসাধন' এবং পরিবারের প্রতি উদাসীনতা নীলাঞ্জনার জীবনের ট্র্যাজেডি ডেকে আনে।
  • নীলাঞ্জনা: উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং সুমিত্রর স্ত্রী। তিনি রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও ভালোবেসে সুমিত্রকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু স্বামীর অবহেলা এবং সংসারের অধিকার না পেয়ে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন।
  • সুরঞ্জনা: নীলাঞ্জনা ও সুমিত্রর কন্যা। মায়ের মৃত্যুর পর এবং বাবার অবহেলার শিকার হয়ে সে এক বিপথগামী জীবন বেছে নেয়। 'দেবী আশ্রম'-এর আড়ালে সে এক উশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে থাকে।
  • অনুভা দেবী: 'দেবী আশ্রম'-এর পরিচালিকা। তিনি সমাজসেবার নামে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখেন এবং সুরঞ্জনার মতো মেয়েদের নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন। বিম্বিসারের চোখে তিনি এবং তাঁর আশ্রম সমাজের এক ভণ্ডামির প্রতীক।
  • মিসেস দস্তিদার: বিম্বিসারের প্রতিবেশী, যিনি নিজেকে সাজসজ্জা এবং আভিজাত্যের মোড়কে মুড়ে রাখতে পছন্দ করেন।

কাহিনীর মোড় ও পরিণতি

[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]

নীলাঞ্জনা স্বামীর ঘর ছেড়ে বাবার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মেয়ে সুরঞ্জনা দাদুর কাছে বড় হওয়ার কথা থাকলেও সেখান থেকে পালিয়ে যায় এবং ঘটনাক্রমে অনুভা দেবীর আশ্রমে এসে পৌঁছায়। উপন্যাসের শেষে দেখা যায়, সুমিত্র দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অবশেষে পুলিশের সহায়তায় তিনি সুরঞ্জনার সন্ধান পান, কিন্তু ততদিনে সুরঞ্জনা এক ভিন্ন মানুষে পরিণত হয়েছে—যে মদ ও সিগারেটে আসক্ত এবং সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। সুমিত্র তাঁর 'আদর্শ' দিয়ে যে সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন, সেই সমাজেরই এক কদর্য রূপ তাঁর নিজের মেয়ের মধ্যে ফুটে ওঠে।

  • "মেয়েদেরকে তোমরা নিজেদের বাঁচার উপকরণ ছাড়া আর কিছু ভাবো না।" - নীলাঞ্জনা
  • "মানুষ যে দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে, নীচ হয়ে যাচ্ছে, নোংরা কুৎসিত হয়ে যাচ্ছে, সমস্ত অধঃপাতে যাচ্ছে এ আমি মানি না।" - বিম্বিসার রায়