অশনি সংকেত
অশনি সংকেত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি উপন্যাস, যা ১৯৪৩-৪৪ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা। ১৯৫৯ সালে মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে বই হিসেবে প্রকাশ পায়।
বিভূতিভূষণ তখন পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও আরণ্যকের সুবাদে প্রতিষ্ঠিত লেখক। কলকাতায় এসে তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ভয়াল চেহারা সরাসরি দেখে তিনি মর্মাহত হন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় এই উপন্যাস। নিজেই বলেছেন, "এত বড় মন্বন্তর ঘটে গেল বাংলাদেশে, অথচ চিত্রে ও রঙ্গমঞ্চে আমরা তার কী ছবি পেলাম?"
বিষয়বস্তু
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]গঙ্গাচরণ নামের এক শিক্ষিত ব্রাহ্মণ তার স্ত্রী অনঙ্গকে নিয়ে নতুন একটি গ্রামে বসতি গড়ে। গ্রামে ব্রাহ্মণ না থাকায় সে সহজেই সবার আস্থা অর্জন করে, পুরোহিতের পদ পেয়ে যায়। তার স্ত্রী অনঙ্গ কোমল স্বভাবের মানুষ, অচিরেই গ্রামের সবার ভালোবাসা পেয়ে যায়। দিন মোটামুটি ভালোই কাটছিল।
তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় পুরো ছবিটা বদলে যায়। ব্রিটিশ সরকার নৌব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, বার্মা থেকে চাল আসা বন্ধ হয়, সেনাদের জন্য গুদামের চাল মজুদ হতে থাকে। বাজার থেকে চাল উধাও, দাম আকাশছোঁয়া। গ্রামে নামে দুর্ভিক্ষ। গঙ্গাচরণ চতুরতা করে কিছু চাল জোগাড় করে রাখে, কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয় না। অনঙ্গ নিজে উপোস করে অন্যকে খাওয়ায়, গ্রামের বউদের সাথে কায়িক শ্রমে নামে। মতি নামের একটি মেয়ে না খেয়ে মারা যায়। ক্ষুধা যে সত্যিই মানুষ মারতে পারে, নতুন গাঁয়ের মানুষ তখন প্রথম বুঝতে পারে।
প্রধান চরিত্রসমূহ
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]- গঙ্গাচরণ চক্রবর্তী: কেন্দ্রীয় চরিত্র। শিক্ষিত, চতুর ব্রাহ্মণ। দুর্ভিক্ষ তার নিজের সংকীর্ণতাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়।
- অনঙ্গ: গঙ্গাচরণের স্ত্রী। উপন্যাসের সবচেয়ে মানবিক চরিত্র। নিজে না খেয়ে অতিথিকে খাওয়ানো তার স্বভাব।
- দুর্গা ভট্টাচার্য: গঙ্গাচরণের বাড়িতে আশ্রিত বৃদ্ধ। মন্বন্তরে ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়।
- মতি: যুবতী মেয়ে, অনাহারে মারা যায়।
- বিশ্বাস মশাই: গ্রামের সম্পন্ন গৃহস্থ, দুর্ভিক্ষের সময় আক্রান্ত হয়ে গ্রাম ছাড়েন।
শৈলী ও তাৎপর্য
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]বিভূতিভূষণের লেখায় সাধারণত প্রকৃতির একটা উদার পরিসর থাকে। অশনি সংকেতে সেই পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে ক্ষুধার চাপে। তবু তার মায়াময় দৃষ্টি এখানেও আছে। দুর্ভিক্ষের অন্ধকারেও অনঙ্গের মতো মানুষ টিকে থাকে, মনুষ্যত্ব হারায় না। উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে মন্বন্তরের সবচেয়ে সৎ ও মর্মস্পর্শী দলিল হিসেবে বিবেচিত।
চলচ্চিত্র রূপান্তর
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]১৯৭৩ সালে সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এটি সত্যজিতের প্রথম রঙিন ছবি। গঙ্গাচরণের ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অনঙ্গের ভূমিকায় বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতা। ছবিটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বিয়ার পুরস্কার পায়।