দিবারাত্রির কাব্য
দিবারাত্রির কাব্য' বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস। সাহিত্যিক বিচারে এটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম রচিত উপন্যাস, যদিও প্রকাশনার ক্রম অনুযায়ী এটি তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস (প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস 'জননী')। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি এই উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থে নর-নারীর সম্পর্কের জটিলতা এবং অবদমিত মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত ও নাটকীয় রূপ ফুটে উঠেছে।
বিষয়বস্তু ও পটভূমি
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]উপন্যাসটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে হেরম্ব নামের এক উদাসীন ও আত্মকেন্দ্রিক যুবককে ঘিরে। গল্পটি তিনটি ভাগে বিভক্ত— 'দিনের কবিতা', 'রাতের কবিতা' এবং 'দিবারাত্রির কাব্য'। আপাতদৃষ্টিতে কাহিনীতে বেশ কিছু নাটকীয় ও ভয়ংকর ঘটনা প্রবাহ দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- আনন্দের আত্মহত্যা।
- সুপ্রিয়াকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার জন্য অশোকের হিংস্র প্রচেষ্টা।
- অনাথ এবং পরবর্তীতে মালতীর নিরুদ্দেশ যাত্রা।
এই ঘটনাগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে আকস্মিক মনে হলেও লেখকের বর্ণনায় এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ। চরিত্রগুলোর অবচেতন মনের অন্ধকার দিক এবং মানসিক বিকার এই ঘটনাগুলোকে অনিবার্য করে তোলে।
সারসংক্ষেপ
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]দিবারাত্রির কাব্যের মূল উপজীব্য হলো মানুষের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা প্রবৃত্তি ও যৌনতা।
- মনস্তত্ত্ব ও যৌনতা: উপন্যাসে যৌনতা এসেছে খুব স্বাভাবিক ও অনিবার্যভাবে, তবে তা স্থূল অর্থে নয়, বরং মনস্তত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। চরিত্রগুলোর প্রেম, ঈর্ষা এবং হিংস্রতা সবই তাদের মনোজাগতিক দ্বন্দের ফসল।
- নারীর ভিন্নরূপ: এখানে প্রথাগত রোমান্টিক নায়িকা নেই; বরং সুপ্রিয়া ও আনন্দের মতো চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে নারীর প্রেম, আত্মত্যাগ ও ধ্বংসাত্মক রূপ ফুটে উঠেছে।
প্রকাশনা তথ্য
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]বইটি মূলত ১৯৩৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। বর্তমান এন্ট্রিটি বাংলাদেশের 'অবসর প্রকাশনা সংস্থা' থেকে ২০১৩ সালে প্রকাশিত ৩য় মুদ্রণের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ১০৪ পৃষ্ঠার এই সংস্করণে লেখকের সেই আদি ও অকৃত্রিম জাদুকরী ভাষার স্বাদ পাওয়া যায়।
মূল্যায়ন
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনের শুরুর দিকের রচনা হলেও 'দিবারাত্রির কাব্য' এর গঠনশৈলী ও বিষয়বস্তুর কারণে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের ছায়া এবং জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে রোমান্টিকতার মোড়কে পরিবেশন না করে সরাসরি তুলে ধরার যে সাহস মানিক দেখিয়েছেন, এই উপন্যাসটি তার অন্যতম প্রমাণ।