অন্নদামঙ্গল
অন্নদামঙ্গল মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত একটি মঙ্গলকাব্য। কাব্যটি দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্যব্যঞ্জক। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে ভারতচন্দ্র এই কাব্য রচনা করেছিলেন। ভারতচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষক নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় বাংলায় প্রতিমায় দেবী অন্নপূর্ণার পূজা প্রচলন করেন। তিনিই ভারতচন্দ্রকে রায়গুণাকর উপাধি প্রদান করে দেবীর মাহাত্ম্যব্যঞ্জক একটি কাব্য রচনার অনুরোধ করেন। ভারতচন্দ্র স্বয়ং এই কাব্যকে "নূতন মঙ্গল" অভিধায় অভিহিত করেছেন। অন্যান্য মঙ্গলকাব্যের ন্যায় অন্নদামঙ্গল গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত হয়নি; এই কাব্য একান্তই রাজসভার কাব্য। মঙ্গলকাব্য ধারায় অন্নদামঙ্গল কাব্যকে একটি পৃথক শাখা রূপে গণ্য করা হয় না, কারণ ভারতচন্দ্র ভিন্ন অপর কোনো কবি এই বিষয়বস্তু অবলম্বন করে কাব্যরচনা করেননি।
রচনার পটভূমি
সম্পাদনানবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের অনুরোধে ভারতচন্দ্র কৃষ্ণনগর গেলে রাজা তাকে চল্লিশ টাকা বেতন ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেন। তার আদেশে ভারতচন্দ্র ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর রচনা প্রণালীতে অন্নদামঙ্গল রচনা করতে শুরু করেন। একজন ব্রাহ্মণ তার রচনা লিখে রাখতেন ও নীলমণি সমাদ্দার নামে এক গায়ক তাতে সুর দিতেন। ভারতচন্দ্র এই কাব্যের আখ্যানবস্তু সংগ্রহ করেছিলেন কাশীখণ্ড উপপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ভাগবত পুরাণ, বিহ্লনের চৌরপঞ্চাশিকা এবং ক্ষিতীশবংশাবলীচরিতম্ ইত্যাদি গ্রন্থ ও লোকপ্রচলিত জনশ্রুতি থেকে।
কাব্যের গঠন ও খণ্ড পরিচয়
সম্পাদনাসমগ্র কাব্যটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত: (ক) অন্নদামঙ্গল বা অন্নদামাহাত্ম্য, (খ) বিদ্যাসুন্দর বা কালিকামঙ্গল ও (গ) মানসিংহ বা অন্নপূর্ণামঙ্গল। এই কাব্য ৩টি খণ্ডে ৮টি পালায় বিভক্ত।
প্রথম খণ্ডে রয়েছে সতীর সঙ্গে শিবের বিবাহ এবং তার পিতা দক্ষ কর্তৃক আয়োজিত মহাযজ্ঞের ধ্বংসলীলার উপাখ্যান। দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে কালকেতু এবং তার উপাসনার মধ্য দিয়ে দেবী অন্নদার পৃথিবীতে আবির্ভাবের উপাখ্যান, এবং তৃতীয় খণ্ডে বর্ধমানের রাজকন্যা বিদ্যা এবং যুবরাজ সুন্দরের কলঙ্কজনক অবৈধ প্রণয়-উপাখ্যান।
প্রধান চরিত্রসমূহ
সম্পাদনাপ্রতিটি খণ্ডের প্রধান চরিত্র: অন্নদামঙ্গল খণ্ডে — ঈশ্বরী পাটনি ও হরিহর; কালিকামঙ্গল খণ্ডে — বিদ্যা ও সুন্দর; অন্নপূর্ণামঙ্গল খণ্ডে — ভবানন্দ মজুমদার ও প্রতাপাদিত্য।
- দেবী অন্নদা (অন্নপূর্ণা): কাব্যের কেন্দ্রীয় দেবীসত্তা।
- ঈশ্বরী পাটনি: এক অনন্য চরিত্র। ঈশ্বরী পাটনির কণ্ঠে প্রথম শোনা গেল বাঙালির চিরন্তন প্রাণের কথা — "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে"।
- বিদ্যা ও সুন্দর: কালিকামঙ্গল খণ্ডের প্রেমিকযুগল।
- ভবানন্দ মজুমদার: অন্নপূর্ণামঙ্গল খণ্ডের ঐতিহাসিক চরিত্র।
- ঈশম শেখ ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র: কাব্যের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের চরিত্র।
প্রকাশনার ইতিহাস
সম্পাদনাসমগ্র অন্নদামঙ্গল কাব্যের কোনো প্রাচীন নির্ভরযোগ্য পুথি পাওয়া যায় না। প্রাপ্ত পুথিগুলির লিপিকাল ১৭৭৬–১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়। ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে এই কাব্যটি প্রথম মুদ্রিত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৪৭ ও ১৮৫৩ সালে এই গ্রন্থের দুটি সংস্করণ প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর কৃত সংস্করণটি আদর্শ ধরে অন্নদামঙ্গল কাব্যের অন্যান্য সংস্করণগুলি প্রকাশিত হয়। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, প্যারিসের বিবলিওথেক নাসিওনেল দে ফ্রান্স, এশিয়াটিক সোসাইটি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে এই কাব্যের কয়েকটি প্রাচীন পুথি সংরক্ষিত আছে।
শৈলী ও তাৎপর্য
সম্পাদনাঅন্নদামঙ্গল কাব্যের বৈশিষ্ট্য হলো ছন্দ ও অলংকারের সুদক্ষ প্রয়োগ। সংস্কৃত ভাষায় পারঙ্গম ভারতচন্দ্র প্রাচীন সংস্কৃত কাব্যের বিভিন্ন ছন্দ ও অলংকার সার্থকভাবে এই কাব্যে প্রয়োগ করেন। তার কাব্যের অনেক পঙ্ক্তি আজও বাংলা ভাষায় প্রবচনতুল্য। উল্লেখযোগ্য প্রবাদবাক্যের মধ্যে রয়েছে: "নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়", "মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন" এবং "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে"।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতচন্দ্রের কাব্য সম্পর্কে বলেছেন, "রাজসভার কবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো তাহার উজ্জ্বলতা, তেমনি তাহার কারুকার্য।"