আ প্যাসেজ টু ইংল্যান্ড
আ প্যাসেজ টু ইংল্যান্ড (ইংরেজি: A Passage to England) প্রখ্যাত বাঙালি লেখক ও চিন্তাবিদ নিরদচন্দ্র চৌধুরী রচিত একটি অনবদ্য ভ্রমণকাহিনী ও সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণমূলক গ্রন্থ। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে লেখক ১৯৫৫ সালে তাঁর প্রথম ইংল্যান্ড ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। এটি তাঁর প্রথম জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলোর মধ্যে একটি এবং এর মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক ও গদ্যকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পটভূমি
নিরদচন্দ্র চৌধুরী ৫৭ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো ভারত ত্যাগ করে ইংল্যান্ড সফরে যান। ব্রিটিশ কাউন্সিলের আমন্ত্রণে ১৯৫৫ সালে তিনি পাঁচ সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন। সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণে ঠাসা সফরের অভিজ্ঞতা থেকেই এই গ্রন্থটির জন্ম। ই. এম. ফরস্টারের বিখ্যাত উপন্যাস আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়ার নামের সাথে মিল রেখে তিনি এর নামকরণ করেন, যা এক ধরণের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ইঙ্গিত দেয়।
বিষয়বস্তু
বইটি কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণ ডায়েরি নয়, বরং ইংরেজ জাতি, তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং ভূপ্রকৃতির এক গভীর বিশ্লেষণ। লেখক এখানে ইংল্যান্ডের জলবায়ু, বাগান, স্থাপত্য এবং মানুষের আচরণের সাথে ভারতের (বিশেষত বাংলার) এক তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন।
বইটি কয়েকটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:
- **The English Scene:** যেখানে তিনি ইংল্যান্ডের নিসর্গ ও আবহাওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।
- **The English People:** এখানে ইংরেজদের সামাজিক শিষ্টাচার, নিরবতা এবং তাদের স্বাতন্ত্র্যবোধ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
- **Cultural Life:** বইটিতে ইংরেজদের শিল্প-সাহিত্য ও উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রতি অনুরাগের কথা উঠে এসেছে।
- **State of the Nation:** লেখক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইংল্যান্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের চিত্রও এঁকেছেন।
শৈলী ও দৃষ্টিভঙ্গি
নিরদচন্দ্র চৌধুরী তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং শাণিত গদ্যের জন্য পরিচিত। 'আ প্যাসেজ টু ইংল্যান্ড'-এ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অতিশয় প্রশংসাসূচক, যা অনেক সময় সমালোচকদের দৃষ্টিতে 'ইংরেজপ্রীতি' (Anglophilia) হিসেবে গণ্য হয়েছে। তবে তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে দেখিয়েছেন যে, একজন ভারতীয় বুদ্ধিজীবী কীভাবে পশ্চিমী সভ্যতাকে গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করতে পারেন। তাঁর হাস্যরস এবং চমৎকার ইংরেজি গদ্যশৈলী বইটিকে সর্বজনীন করে তুলেছে।
প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
প্রকাশের পর বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং লেখককে ব্রিটিশ পাঠকদের কাছে পরিচিত করে তোলে। যদিও সমসাময়িক ভারতের অনেক সমালোচক তাঁর এই অতি-উৎসাহী পশ্চিমী মনোভাবের সমালোচনা করেছিলেন, তবুও সাহিত্যিক মানদণ্ডে এটি একটি ধ্রুপদী সৃষ্টি হিসেবে টিকে আছে। টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বইটি উচ্চ প্রশংসা লাভ করে।