রাজর্ষি
রাজর্ষি হল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত একটি অনবদ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস। ১৮৮৭ সালে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ত্রিপুরার রাজপরিবারের ইতিহাস এবং মানুষের চিরন্তন মানবিকতাবোধকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি গড়ে উঠেছে। এই উপন্যাসের একটি বড় অংশকে ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে তার বিখ্যাত বিসর্জন নাটকটি রচনা করেছিলেন।
পটভূমি ও রচনা ইতিহাস
সম্পাদনারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবনস্মৃতি গ্রন্থে এই উপন্যাসটি রচনার এক চমৎকার নেপথ্য কাহিনী উল্লেখ করেছেন। তৎকালীন বালক নামক একটি মাসিক পত্রিকার জন্য গল্প ভাবার সময় তিনি ট্রেনে একটি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তিনি দেখেন, কোনো এক মন্দিরের সিঁড়িতে রক্তের দাগ দেখে একটি ছোট বালিকা অত্যন্ত করুণ ব্যাকুলতায় তার বাবাকে জিজ্ঞেস করছে— "বাবা, একি! এ যে রক্ত!" বালিকার এই কাতরতা এবং বাবার মনের ব্যথা কবিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই স্বপনলব্ধ কাহিনীর সাথে ত্রিপুরার মহারাজ গোবিন্দমাণিক্যের ইতিহাসের মিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি প্রতি মাসে বালক পত্রিকায় কিস্তিবন্দী হিসেবে 'রাজর্ষি' লিখতে শুরু করেন।
বিষয়বস্তু
সম্পাদনাউপন্যাসটির মূল বীজপ্রশ্ন লুকিয়ে আছে মহারাজ গোবিন্দমাণিক্যের জীবনাচরণের মধ্যে— এত রক্ত কেন? ত্রিপুরার রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী পশুবলি প্রথার বিরুদ্ধে মহারাজের অবস্থান, রাজপুরোহিত রঘুপতির সাথে তার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং ধর্মের নামে হিংসার বিপরীতে অহিংসার বাণীই এই আখ্যানের মূল উপজীব্য। স্বপ্নের সেই বালিকাটি এখানে হাসি এবং তার ভাই তাতাত চরিত্র হিসেবে উপন্যাসে স্থান পেয়েছে, যাদের সরলতা ও ট্র্যাজেডি কাহিনীর মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শুধু কিশোর পাঠকদের জন্যই নয়, বরং পরিণত পাঠকদের জন্যও এটি জীবনায়নের এক অনবদ্য অহিংসমন্ত্র।
প্রধান চরিত্রসমূহ
সম্পাদনা- গোবিন্দমাণিক্য: ত্রিপুরার ন্যায়পরায়ণ ও অহিংস অনুরাগী মহারাজ।
- রঘুপতি: রাজপুরোহিত, যিনি পশুবলি প্রথার উগ্র সমর্থক এবং মহারাজের বিরোধী।
- জয়সিংহ: রঘুপতির পালিত পুত্র, যার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব উপন্যাসের অন্যতম মূল আকর্ষণ।
- হাসি ও তাতাত: দুটি অনাথ শিশু, যাদের সরলতা মহারাজের হৃদয় পরিবর্তন করে।