পরানবন্দী
পরানবন্দী লেখক ডা. শামসুল আরেফীন-এর লেখা একটি উল্লেখযোগ্য ভ্রমণকাহিনীমূলক বই। বইটি প্রকাশ করেছে সন্দীপন প্রকাশন লিমিটেড। এতে মূলত হজ ও ওমরাহ পালনের সময় মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোর প্রতি আত্মিক টান এবং গভীর আবেগ-অনুভূতির এক মনোমুগ্ধকর বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। বইটি মুমিন হৃদয়ের এক নিবিড় আধ্যাত্মিক যাত্রাকে চিত্রিত করে, যেখানে পবিত্র স্থানগুলোর সাথে ব্যক্তির আত্মিক বন্ধন কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
পটভূমি ও বিষয়বস্তু
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]ডা. শামসুল আরেফীন রচিত 'পরানবন্দী' বইটি মুসলিমদের আত্মিক উপলব্ধি এবং পবিত্র স্থানগুলোর প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা। বইটিতে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে যে, মুমিনদের অন্তর বিশেষভাবে নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি এক অনির্বচনীয় আকর্ষণ অনুভব করে। লেখকের মতে, এই সম্পর্ক এমন গভীর যে, এটি আবেগ, ভালোবাসা এবং শিহরণ জাগিয়ে তোলে যা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। নবীজিকে মুসলিমদের সম্মান ও গাইরত (মর্যাদা) হিসেবে উল্লেখ করে, লেখক বুঝিয়েছেন যে তাঁর প্রতি এই ভালোবাসা এতটাই জোরালো যে অনেক মুসলিম জান্নাতকেও তাঁর থেকে বড় মনে করে না।
বইটিতে নবীজির রওজা মোবারক (সমাধিস্থল) ও রিয়াজুল জান্নাতে সফরের ব্যক্তিগত ও মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হয়েছে। যারা এসব পবিত্র স্থান স্বচক্ষে দেখেছেন এবং সেখানে নামাজ আদায় করেছেন, তাদের হৃদয়ের গভীরে যে এক অবিস্মরণীয় অনুভূতির জন্ম হয়, লেখক তা নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। বইটিতে এই অনুভূতিকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যে মনে হয়, মুমিনের হৃদয় সবুজ গম্বুজের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে বাঁধা পড়েছে। এই বাঁধা পড়ার অনুভূতি এমনই প্রবল যে, সেখান থেকে ফিরে আসার কথা মনে হলে হৃদয়ে তীব্র মোচড় দেয় এবং মন চায় চিরকাল সেখানেই অবস্থান করতে।
একইভাবে, বাইতুল্লাহ শরীফ (কাবা) দর্শনের অভিজ্ঞতাও লেখকের বর্ণনায় অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে ওঠে। কাবা শরিফ দেখে ভক্তদের চোখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অশ্রু ঝরে পড়ার দৃশ্য বইটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, এবং সেখানেই জীবনের বাকি অংশ কাটিয়ে দেওয়ার এক আকুল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়। "আমি শুয়ে আছি কাবার ছায়ায়, কেন আমাকে জাগিয়ে দেওয়া হবে! আমি আশ্রয় নিয়েছি জান্নাতের টুকরায়, কেন আমাকে ভিসার কথা বলে তাড়া দেওয়া হবে!"—বইটিতে এমন হৃদয়গ্রাহী অনুভূতিগুলো স্থান পেয়েছে, যা একজন হজ-যাত্রীর গভীর আত্মিক টানকে প্রকাশ করে। যাত্রার নির্ধারিত সময় ফুরিয়ে আসার সাথে সাথে হৃদয়ে যে তীব্র শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি হয়, লেখক তা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন।
মূলত একটি ভ্রমণকাহিনী হলেও, বইটির বর্ণনা এতটাই হৃদয়গ্রাহী যে তা পাঠকের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলে। ডা. আরেফীন হজের অভিজ্ঞতাকে এমন মনোমুগ্ধকরভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তা পাঠকের মনকে গলিয়ে দেয় এবং মুমিনের আত্মিক বন্ধন বা 'পরান' যে আসলেই কোথায় বাঁধা, সে সম্পর্কে এক নতুন উপলব্ধি এনে দেয়।