জোছনা ও জননীর গল্প
জোছনা ও জননীর গল্প হুমায়ূন আহমেদ রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, যা তার নিজের ভাষায় ছিল দেশমাতৃকার প্রতি একটি ঋণশোধ। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। পাঁচশো পাতারও বেশি এই উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসকে ধরতে চেয়েছেন সাধারণ মানুষের জীবনের ভেতর দিয়ে। নিজেও ছিলেন সেই সময়ের সাক্ষী, তাই বইয়ে তার নিজের অভিজ্ঞতার ছায়া বারবার পড়েছে।
হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, "সে বড় অদ্ভুত সময় ছিল। স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের মিশ্র এক জগত। সবই বাস্তব, আবার সবই অবাস্তব।"
বিষয়বস্তু
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]উপন্যাসের শুরু ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে, যখন নীলগঞ্জ হাইস্কুলের আরবি শিক্ষক মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরীর ছোট ভাই শাহেদ ঢাকায় আসে ভাই ও ভাবিকে দেখতে। কিছুদিনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, আর সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়।
শাহেদের স্ত্রী আসমানী অভিমানে বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরদিনই ২৫ মার্চের কালরাত নেমে আসে। এরপর থেকে শাহেদের পুরো নয় মাস কেটেছে আসমানীকে খুঁজে ফেরায়, ভয় ও অনিশ্চয়তায়। অবশেষে যুদ্ধ শেষে সে আসমানীকে ভারতে খুঁজে পায়। কিন্তু অনেক শাহেদ সেই সৌভাগ্য পায়নি। শাহেদের মাধ্যমে একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে যুদ্ধের পুরো সময়টা দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি মাওলানা ইরতাজউদ্দিনের মতো চরিত্রের মাধ্যমে উঠে এসেছে সেই মানুষদের গল্প, যারা প্রথমে পাকিস্তানকে সমর্থন করলেও পরে বুঝতে পেরেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঠিক কতটা নৃশংস।
উপন্যাসে ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৫শে মার্চের গণহত্যা, অস্থায়ী সরকার গঠন থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী হত্যা পর্যন্ত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো এসেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মেজর জিয়া, ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো, ইন্দিরা গান্ধীসহ বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বও উপন্যাসে এসেছেন।
প্রধান চরিত্রসমূহ
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]- শাহেদ: উপন্যাসের প্রধান চরিত্র, মাওলানা ইরতাজউদ্দিনের ছোট ভাই। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু নয় মাস এক দুর্বিষহ মানসিক যুদ্ধ করেছেন।
- আসমানী: শাহেদের স্ত্রী, যে যুদ্ধের শুরুতেই হারিয়ে যায়।
- রুনি: শাহেদ ও আসমানীর শিশুকন্যা।
- মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরী: নীলগঞ্জ হাইস্কুলের আরবি শিক্ষক, বগলে রাজহাঁস নিয়ে চলা এই মানুষটি প্রথমে পাকিস্তানপন্থী ছিলেন, পরে সত্য বুঝতে পারেন।
- নাইমুল: শাহেদের বন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধা।
- গৌরাঙ্গ: শাহেদের হিন্দু বন্ধু, যার মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
- কংকন: যুদ্ধের মাঝে মায়ের হাত হারিয়ে ফেলা শিশু।
- হুমায়ূন আহমেদ: লেখক নিজেও একটি চরিত্র হিসেবে উপন্যাসে আছেন।
টেলিভিশন ধারাবাহিক
[সম্পাদনা | উৎস সম্পাদনা]২০০৮ সালে বিটিভিতে এই উপন্যাস অবলম্বনে একটি ধারাবাহিক সম্প্রচার শুরু হয়, পরিচালনায় ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ নিজেই। তিন পর্ব প্রচারের পর তিনি ঢাকায় লালন ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে কাজ বন্ধ করে দেন। পরে ২০১০ সালে আবার কাজ শুরু হয়।
