কাঠগড়া (কষ্টিপাথর - ৩)
কাঠগড়া (কষ্টিপাথর - ৩) লেখক ডা. শামসুল আরেফীন-এর লেখা একটি উল্লেখযোগ্য বই। বইটি প্রকাশ করেছে সন্দীপন প্রকাশন লিমিটেড। এটি লেখকের বহুল পঠিত 'কষ্টিপাথর' সিরিজের তৃতীয় খণ্ড, যা ২০২১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামের সম্পর্ক, বিশেষত তথাকথিত 'বিজ্ঞানমনস্কতা'র নামে ইসলাম-বিরোধী প্রচারণার জবাব এবং ইসলামের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তুলে ধরার একটি প্রয়াস।
পটভূমি ও বিষয়বস্তু
বর্তমান যুগকে প্রায়শই 'বিজ্ঞানের যুগ' বলে অভিহিত করা হয়। এই বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটকে ব্যবহার করে সমাজে একদল 'বিজ্ঞান লেখক' এবং বিভিন্ন 'বিজ্ঞানভিত্তিক সামাজিক মাধ্যম গোষ্ঠী' সক্রিয় রয়েছে, যারা বিজ্ঞানের নামে বিভিন্ন ধারণা প্রচার করে থাকে। ডা. শামসুল আরেফীনের পর্যবেক্ষণে, এদের প্রচারিত বিষয়বস্তু প্রায়শই বিশুদ্ধ বিজ্ঞান না হয়ে 'কলাবিজ্ঞান' বা এক প্রকার অপবিজ্ঞান রূপে প্রকাশিত হয়। তাদের বিজ্ঞান উপলব্ধির সাথে পশ্চিমা একাডেমিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের ধারণার মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। এই গোষ্ঠীগুলো ইসলামকে বিজ্ঞানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে একটি কৃত্রিম সংঘাত তৈরি করার চেষ্টা করে এবং দাবি করে যে, ইসলাম ও বিজ্ঞান পরস্পর সাংঘর্ষিক। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহকে অবৈজ্ঞানিক আখ্যা দিয়ে অবজ্ঞা করে এবং মনে করে যে, ১৪০০ বছর পূর্বের জীবনবিধান এই 'আধুনিক' যুগে অপ্রাসঙ্গিক।
'কাঠগড়া (কষ্টিপাথর - ৩)' বইটি এই প্রচলিত ভুল ধারণার একটি শক্তিশালী এবং যৌক্তিক জবাব হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। লেখক ডা. শামসুল আরেফীন দৃঢ়ভাবে এই মতবাদ খণ্ডন করেছেন যে, ইসলাম বিজ্ঞানবিরোধী। বরং তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, চির-আধুনিক এবং সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞানসম্মত জীবনবিধান। তাঁর মতে, আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের বহু আবিষ্কারের শত শত বছর পূর্বেই সৃষ্টিকর্তা তাঁর প্রিয়তম রাসূলের মাধ্যমে মানবজাতিকে সর্বাধুনিক জীবনদর্শন ও বিজ্ঞানভিত্তিক পথনির্দেশনা প্রদান করেছেন, আর তা হলো ইসলাম।
বইটিতে লেখক বিশেষভাবে চিকিৎসাবিদ্যা এবং গণিত শাস্ত্রে মুসলিম সভ্যতার অনস্বীকার্য অবদানসমূহ বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি ঐতিহাসিক তথ্য এবং যুক্তির মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে মুসলিম পণ্ডিতরা এই ক্ষেত্রগুলিতে যুগান্তকারী গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। একই সাথে, তিনি ইসলাম ধর্মের কয়েকটি সুন্নাহকে আধুনিক বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোকে বিশ্লেষণ করে সেগুলোর মু'জিযা (অলৌকিকত্ব বা বৈজ্ঞানিক সুসংগততা) প্রদর্শন করেছেন। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো পাঠককে এই মৌলিক সত্যটি উপলব্ধি করানো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথেই ইহকাল ও পরকালের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং ব্যবহারিক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের মাধ্যমে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটি প্রয়াস।
ডা. শামসুল আরেফীনের সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম, যার মধ্যে 'কষ্টিপাথর', 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড' এবং 'মানসাঙ্ক' অন্যতম, ইসলামি মতবাদ ও আদর্শের যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদানে এবং আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 'কাঠগড়া' বইটিও সেই ধারাবাহিকতায় ইসলাম-বিরোধী বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে এবং মুসলিমদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক। লেখক তার লেখায় সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ইসলামি বিধান অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, যা মানুষকে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সমাধানের পথেই ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।