খোঁয়ারি
খোঁয়ারি উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিমান কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচিত দ্বিতীয় ছোটগল্প সংকলন, এবং বাংলা সাহিত্যে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও রূঢ় সামাজিক বাস্তবতাবাদের একটি অন্যতম কালজয়ী নিদর্শন। এটি ১৯৮২ সালের ১ জানুয়ারি রাজশাহীর তরঙ্গ প্রকাশনা থেকে প্রথম গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকেও বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তীব্র জীবনবোধ ও সূক্ষ্ম সমাজ-পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গ্রন্থে লেখকের নিজস্ব আখ্যানশৈলী ও রুক্ষ-শুকনো ভাষাভঙ্গি উন্মোচিত হয়েছে, যার প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান।
বিষয়বস্তু
'খোঁয়ারি' গ্রন্থটি মূলত চারটি দীর্ঘ ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক গল্পের সংকলন। গল্পগুলোর ভেতর দিয়ে লেখক মানবজীবনের চিরন্তন কিছু অনুষঙ্গ—যেমন নৈঃসঙ্গ্য, অবদমিত যৌনতা, বার্ধক্য, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক রূপান্তর এবং অবধারিত মৃত্যুকে এক নির্মম বাস্তবতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এই সংকলনের গল্প চারটি হলো: 'খোঁয়ারি', 'অসুখ-বিসুখ', 'তারাবিবির মরদ পোলা' এবং 'पितৃবিয়োগ'। প্রত্যেকটি গল্পেই প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভেতরের টানাপোড়েন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে।
নামগল্প 'খোঁয়ারি'-র পটভূমি পুরান ঢাকা, যেখানে দেশভাগ, দাঙ্গা ও মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতে বদলে যাওয়া একটি সংখ্যালঘু পরিবারের অস্তিত্বের সংকট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে 'অসুখ-বিসুখ' গল্পে বিত্তহীনতার সমান্তরালে এক জরাগ্রস্ত বৃদ্ধার মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও ক্যানসারের নির্মম আগমনী বার্তা বিধৃত। 'তারাবিবির মরদ পোলা' গল্পটিতে ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের আলোকে এক নারীর অবদমিত যৌন-অতৃপ্তি ও ঈর্ষার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। শেষ গল্প 'पितৃবিয়োগ'-এ অবধারিত মৃত্যুচিন্তা ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এক সার্থক সাহিত্যিক রূপ পেয়েছে।
প্রধান চরিত্রসমূহ
- অমৃতলাল: 'খোঁয়ারি' নামগল্পের প্রধান চরিত্র। পুরান ঢাকার এক প্রাচীন জরাজীর্ণ বসতবাড়ির এই বৃদ্ধ মালিক দেশভাগ, ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিমন্থন করে দিনাতিপাত করেন এবং শেষ বয়সে এসে বসতবাড়ি দখলের রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।
- সমরজিৎ: অমৃতলালের একমাত্র ছেলে, যার বামপন্থী ও রাজনৈতিক বন্ধুদের আনাগোনার সূত্র ধরেই পৈতৃক বাড়িটি দলীয় কার্যালয় হিসেবে দখলের নতুন সংকট তৈরি হয়।
- আতমন্নেসা: 'অসুখ-বিসুখ' গল্পের মূল চরিত্র; একজন জরাগ্রস্ত ও ক্যানসারাক্রান্ত বৃদ্ধা, যিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের স্বাভাবিক জীবন দেখে তীব্র নিঃসঙ্গতা, ক্ষোভ ও উপেক্ষার যন্ত্রণায় দগ্ধ হন।
- তারাবিবি: 'তারাবিবির মরদ পোলা' গল্পের এক নিঃসঙ্গ ও যৌন-অতৃপ্ত নারী, যিনি স্বামীর প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ করেন এবং সতীনের সংসারে কুটিল প্ররোচনা দিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে লিপ্ত থাকেন।
সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া
১৯৮২ সালে 'খোঁয়ারি' প্রকাশের পর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তৎকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের অগ্রগণ্য ও অগ্রবর্তী লেখক হিসেবে দৃঢ়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। সাধারণ ও প্রথাগত গল্পের বলয় ভেঙে তাঁর এই গল্পগুলোর রুক্ষ, মেদহীন এবং তীব্র বাস্তবধর্মী ভাষা সমালোচকদের দ্বারা উচ্চ প্রশংসিত হয়। ব্যক্তিমানুষের অবদমিত মনস্তত্ত্বের সাথে সমাজ ও ইতিহাসের জটিল সন্ধিক্ষণকে যেভাবে তিনি এক সুতোয় গেঁথেছেন, তা বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।
অনুবাদ
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই সংকলনের বেশ কিছু গল্প এবং তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের নির্বাচিত অংশ ইংরেজি ও ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
আরও দেখুন
সূত্র
- আহমেদ, আশরাফ উদ্দীন (৬ আগস্ট ২০২০). "খোঁয়ারি : অসাধারণ মমত্বময় গল্প". দৈনিক ভোরের কাগজ।
- "খোঁয়ারি ও ইলিয়াস". দৈনিক জনকণ্ঠ (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০)।